জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও: দিপু মালাকার

চমনলাল ছিলেন দীর্ঘদেহী ভারতীয় অফিসার। ২১ নভেম্বর সকালেই মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা পাক হানাদারেরা এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

জকিগঞ্জ: চমনলাল ছিলেন দীর্ঘদেহী ভারতীয় অফিসার। ২১ নভেম্বর সকালেই মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা পাক হানাদারেরা এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সুরমা নদীপাড়ের বাংকারগুলোতে পাকসেনাদের লাশ পড়ে আছে। তবে শহরের ভেতর থেকে ভারতের করিমগঞ্জকে লক্ষ্য করে আর্টিলারির গোলাবৃষ্টি চলছে হানাদারদের। করিমগঞ্জ থেকেও সমানতালে আর্টিলারি হামলা করে যাচ্ছে ভারতীয় মিত্রবাহিনীও।

 

জকিগঞ্জে মুক্তিবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করতে করিমগঞ্জ থেকে নিজেই রাবারের নৌকায় চাপলেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন চমনলাল। সঙ্গে মিত্রবাহিনীর আরো ৩ জন  সদস্য। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সরু সুরমা পার হয়ে গেলেন। সুরমা নদীর পাড় নিরাপদই ভেবে রেখেছিলেন তারা।

কুশিয়ারা নদীর ওপারে করিমগঞ্জে ছিল মিত্রবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি।
কিন্তু জকিগঞ্জের পাড়ে নামতেই একটি গুলি এসে বিঁধলো চমনলালের বুকে। নদীর পানিতে ঢলে পড়লো ভারতীয় ক্যাপ্টেনের দেহ। সঙ্গে আসা সৈনিকেরা দ্রুত পজিশন নিয়ে খেয়াল করলেন, হানাদারদের একটি বিধ্বস্ত বাংকার থেকে ছুটে এসেছে বুলেট।সেখানে আহত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলো এক হানাদার। পরে তাকে আক্রমণ করে নিশ্চিহ্ন করে দেন মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা।

চমনলালের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় করিমগঞ্জে। বর্তমানে করিমগঞ্জ জেলা প্রশাসক অফিসের সামনেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে চমনলালের স্মরণে।  চমনলাল ছাড়াও এদিন জকিগঞ্জ মুক্ত করতে আরো ২ জন ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন।

জকিগঞ্জে পাকিস্তানিদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি ছিল আটগ্রাম ডাকবাংলোয়।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভৌগলিকভাবে জকিগঞ্জ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান বাহিনীর কাছে যেমন তেমনি ভারতীয়দের কাছেও। জকিগঞ্জের দক্ষিণে কুশিয়ারা নদীর ওপারেই করিমগঞ্জ মহকুমা। তাই ভারতীয় বাহিনীরও ভয় ছিল এই থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান নিয়ে।

৮ মে তারিখ বিকেলে প্রথম জকিগঞ্জ আসে পাকিস্তানি বাহিনী। পৌরসভার মোড়ে সেদিন মাইকে ঘোষণা দিয়ে যায় ৫ মিনিটের মধ্যে কারফিউ শুরু, সকলে বাড়ি চলে যেতে। পাকবাহিনী ফেরার সময় এলোপাতাড়ি গুলি করলে এক রেস্টুরেন্টকর্মী কিশোর শহীদ হয়।

মার্চের শুরু থেকেই আনসার ও মুজাহিদরা জকিগঞ্জে নিজেরা প্রশিক্ষণ দিতেন তরুণদের। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের হামলার পর দেশের অন্যান্য ইপিআর ক্যাম্পের মতো এখানেও ইপিআর ক্যাম্পে পাঞ্জাবি আর বালুচ সদস্যদের হত্যা করে বাঙালি ইপিআর সদস্যরা।

করিমগঞ্জ থেকে মিত্রবাহিনীর ছোড়া সেলের চিহ্ন এখনো রয়েছে নদী পাড়ের স্থাপনায়।
যুদ্ধের শুরু থেকেই সিলেটের অনেক মানুষ এই জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে থাকেন। করিমগঞ্জে প্রস্তুতি চলতে থাকে সংগ্রাম পরিষদের। ভারতীয় বিএসএফ এবং আসামের লোকেরা সাহায্য করে শরণার্থী এবং মুক্তিযুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক তরুণদের।

১৯ মে দুপুরে আবারো সেনা বৃদ্ধি করে জকিগঞ্জ আসে পাকবাহিনী। এদিনই তারা এসে রাজাকারদের সাহায্যে তৎকালীন এমএনএ আব্দুল লতিফসহ স্থানীয় নেতাদের খোঁজে।  মুক্তিযুদ্ধের পুরো  সময়জুড়েই এই অঞ্চলে  রাজাকার বাহিনীর প্রাদুর্ভাবও ছিল অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের ঘরদোর পুড়িয়ে দেয় তারা। এর মধ্যেই মুক্তিবাহিনীর ট্রানজিট ক্যাম্প করা হয় করিমগঞ্জে।

গেরিলারা জকিগঞ্জে পাকিস্তানি ঘাঁটিতে প্রথম হানা দেয় ৭ জুলাই। এরপর ২২ নভেম্বর মুক্ত হওয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ চলেছে কোথাও না কোথাও।

মিত্রবাহিনীর ছোড়া সেলের আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় হানাদারেরা।
৭ জুলাই বারোপুঞ্জি সাবসেক্টর থেকে ক্যাপ্টেন রব আসেন করিমগঞ্জে। সেখান থেকে কয়েকজনসহ মোট ৪১ জনের দল নিয়ে জকিগঞ্জে অভিযান চালান। আনসার ও ইপিআর এর অস্ত্র ছাড়াও ভারতীয়দের সাহায্যে দেয়া কিছু অস্ত্র ছিল। অভিযানে আহমেদ আলী স্বপন এবং হানিফ তালুকদার নামে দুই রাজাকারকে ধরে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানকার সাবসেক্টর ছিল জালালাবাদ। মে মাস থেকেই  করিমগঞ্জে অবস্থান নেয়া তরুণরা শিলচরের ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে লোহারবন্দে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন।

করিমগঞ্জ থেকে রাবার, পাম্পের বালিশ দিয়ে বানানো নৌকায় সুরমা পার হতো মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী। করিমগঞ্জেও ভারতীয় বাহিনীর আরআর গান, ট্যাংক ও কামান রাখা ছিল বাংলাদেশে পাকবাহিনীর ক্যাম্পগুলো লক্ষ করে। জকিগঞ্জে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণগুলোকে ওপার থেকেই কাভারিং দেয়া হতো।

এই সাবসেক্টরের ক্যাম্প ছিল ১২ টি। অমলসিদ, ভাঙ্গা, রঘুরচর, কালাবাল্লা, বাঙালিপাড়া, সালামটিলা, মমতাজগঞ্জ,মণিপুর, লুবাছড়া, বাঘানা ও ডাউকি। এসব ক্যাম্পে ছিল অ্যাডভান্স টিম। যারা যুদ্ধের প্রথমে অগ্রসর হতো। আর মিত্রবাহিনী কাভারিং দিতো।
মুক্তিবাহিনীকে সহযোগীতার দায়ে ১২ যুবককে হত্যা করে রাজাকারেরা।
জকিগঞ্জে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ হয় আটগ্রামে। সেখানে বাসস্ট্যান্ড এবং ডাকবাংলোতে শক্ত ঘাঁটি গেড়েছিল পাক হানাদারেরা। ১২ নভেম্বর প্রথম আটগ্রামে শক্তিশালী অপারেশন পরিচালনা করে মিত্রবাহিনী। এদিন সকালেই ভারতীয় ক্যাপ্টেন কুমারের সঙ্গে বৈঠক করেন সেক্টর কমান্ডার মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত(সি আর দত্ত),  ক্যপ্টেন রব ও দেওয়ান ফরিদ গাজী। সেদিনই আটগ্রাম দখলের পরিকল্পনা করা হয়।

এটা ছিল রমজান মাস। করিমগঞ্জ থেকে ৬ ফাউন্ডার ফিট করে রাখা হয় আটগ্রামের দিকে। এই ৬ ফাউন্ডারের গোলা ২ থেকে ৩ মাইল দূরে পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম ছিল। সেদিন রাতেই অপারেশন করা হয়। মুক্তিবাহিনীর বীরেরা গুলি করতে করতে অনেক সামনে চলে গিয়েছিলেন। এক সময় সামনাসামনি হয়ে যায় দুই পক্ষই। তখন কৌশল হিসেবে নির্দেশ আসে পিছু হটার। যুদ্ধ প্রায় ভোর পর্যন্ত চলে। এদিন ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝখানে আইয়ুব আলী,লালাবাজারের খালিক, শুলাগুলার আফসানের লাশ পড়ে ছিল। আনা যায়নি। ধারণা সেই রাতে ১০ থেকে বারো জন পাকসেনা মারা যায়। এই অভিযানে কোম্পানি কমান্ডার নিজামের কোমরে গুলি লাগে।

রমজানের আরেকটি ঘটনা। সেহেরির আগে কয়েকজন পাক সৈন্য খাবার নিয়ে বাসস্ট্যান্ড থেকে ডাকবাংলো যাচ্ছিল। এসময় জকিগঞ্জের সাহসী মুক্তিযোদ্ধা নোমান কয়েকজন গেরিলাকে নিয়ে ২ জন পাক সেনাকে অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে আসেন। বন্দীদের মাছিমপুর সাবসেক্টরে নিয়ে যাওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, ভারতীয় সেনাদের দেশপ্রেম পাকিস্তানি সেনাদের চেয়ে বেশি ছিল। তারা সাহসীও ছিল বেশি।  


যুদ্ধের পর যুবকদের আত্মীয়রা তাদের কবর দেয়।
জকিগঞ্জের সোনাপুরের যুদ্ধও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ছিল পাকিস্তানি ক্যাম্প। নৌকায় করে আসে মুক্তিবাহিনী। এদিন আক্রমণ করে দুইজন রাজাকরকে ধরে আনা হয়। একই দিনে কোটালপুর ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ব্রিজে বিস্ফোরক বসানোর পর আগুন দিতে কিছু সময় লাগে। এ সময় ব্রিজের অপর পাড়ে চলে আসে পাকবাহিনী। মুক্তিবাহিনীর পক্ষে খলিল ছিলেন ব্রিজের গোড়ায় মর্টার নিয়ে।

দুই পাড়ের মধ্যে গুলি বিনিময় শুরু হয়। আহত হন মুক্তিযোদ্ধা মোক্তাদির হায়দার। এরই মধ্যে বিস্ফোরকে আগুন দিতে সক্ষম হয় মুক্তিবাহিনী। দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে কিছুদূর যেতেই উড়ে যায় ব্রিজটি। মুক্তিবাহিনীর কাছে এলএমজি, এসএমজি ও রাশিয়ান অস্ত্র ছিল।

জকিগঞ্জের একটি ট্র্যাজিক ঘটনা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার অপরাধে ১২ জন যুবককে ধরে নিয়ে হত্যা করে রাজাকারেরা।

৯ নভেম্বর শেখ পাড়ার পুরঞ্জন দাসের পরিত্যক্ত বাড়িতে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের ক্যাম্প রাতে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করে। এইসময় ১২ যুবক সাহায্য করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ১০ নভেম্বর বাবুল আহমেদের নেতৃত্বে ১০ জন রাজাকার ওই যুবকদের আটক করে সকালে। এরপর তাদের ডাকবাংলোতে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হানাদার ক্যাপ্টেন বসারাতের নির্দেশে পালবাড়িতে গুলি করে হত্যার পর যুবকদের মাটি চাপা দেওয়া হয়। ২১ নভেম্বর জকিগঞ্জ মুক্ত হলে আত্মীয়স্বজন সেইসব লাশ তুলে এনে লোহারমহল গ্রামে সমাহিত করেন।

বাংলানিউজের কাছে জকিগঞ্জের যুদ্ধের বর্ণনা করেন মুক্তিযোদ্ধারা।
এই ১২ জন শহীদ হচ্ছেন নূর উদ্দিন, আছাব আলী, ইলিয়াছ আলী, নীলাম্বর আলী, আব্দুর রহমান, চেরাগ আলী, আব্দুর ছাত্তার,হায়াত আলী, আব্দুল জলিল, আকদ্দছ আলী, মিরজান আলী ও সানুহর আলী।

জকিগঞ্জে বেশ কিছু একটি গুরত্বপূর্ণ অপারেশন হয়। ২৫ মে তারিখে ফেউলাগ্রামে ২ রাজাকার নিহত হয়, ২ জন বন্দি হন। ৭ জুন জকিগঞ্জের নামারগ্রামে ২ জন রাজাকার মারা যায় এবং ১ জন দারোগা বন্দী হন। ৭ জুলাইতে শরীফগঞ্জে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং আহত হন ২ জন। মধ্য আগস্টে লোহারগ্রামে ২ জন রাজাকার নিহত হয়। এ সময় লোহারগ্রামে আরেকটি অপারেশনে ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ৬ জন আহত হন। ২০ আশ্বিন আটগ্রামে ত্রিমুথানায় ২ রাজাকার বন্দী হয়।  ২১ কার্তিক রোকনগঞ্জে ২ জন রাজাকার আহত হয়। ১৬ অক্টোবর বিয়াবাইলে ২ জন রাজাকার বন্দী হয়, ২জন আহত হয়। ১৮ অক্টোবর সুলতানপুর গ্রামে ২ রাজাকার আহত হয়।  ৬ নভেম্বর বড়জরা ব্রিজে ২ রাজাকার নিহত এবং ২ জন আহত হয়। আইবোড় থেকে দুকেরমুড়ার পথের অপারেশনে ১ রাজাকার নিহত হয়, আহত হয় ১৯ জন। ১৫ নভেম্বরে তিনজন রাজাকার আহত এবং ২ জন বন্দী হয়। ৩০ অক্টোবরে ভূইয়ার মোড়ে ১ জন রাজাকার আহত এবং ১ জন বন্দী হয়। ৯ নভেম্বরে লোহারগ্রামে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ১ জন আহত হন। ১২ নভেম্বরে আটগ্রামের ডাকবাংলোয় ৪ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এদিন ৩০ জন রাজাকার শহীদ হয়, আহত হয় ৩ জন, বন্দী হয় ৪ জন।

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৬
এমএন/জেএম
সহযোগিতায়:

যারা বর্ণনা করেছেন:
শহীদ ইলিয়াছ আলীর সন্তান মঈনুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মোক্তাকিম হায়দার, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার খলিল উদ্দিন ও মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী।

সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিসহ আটক ৪
হলি আর্টিজান মামলায় ২১ জনের নামে চার্জশিট
‘জিতলে আমি জার্মান, হারলে শরণার্থী’
বিদেশ যেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ ইমরান এইচ সরকার
গর্ভকালীন সময়ে যা খেতে নেই
কাপড় শুকাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে গৃহবধূর মৃত্যু
সেই ১২ শিক্ষার্থীর ৯ জন পাস করেছে
যশোরে অজ্ঞাত ২ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার
নওয়াজ অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ মেডিকেল টিমের
তামিমের আগে পুরো ইনিংস ব্যাট করার কীর্তি যাদের