হরিদাসের বাড়ি হয়ে মাইল্লাম, ‘ভারত কত দূর?’

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: দীপু মালাকর-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

মেঘালয়ের খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে টলটলে স্বচ্ছ পানির বহমান নদী। তার ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠে মাইল্লাম শরণার্থী শিবির। সীমানা নির্ধারণী পিলারের এপারে সুনামগঞ্জ আর ওপারে মেঘালয়ের মাইল্লাম।

সুনামগঞ্জ: মেঘালয়ের খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে টলটলে স্বচ্ছ পানির বহমান নদী। তার ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠে মাইল্লাম শরণার্থী শিবির। সীমানা নির্ধারণী পিলারের এপারে সুনামগঞ্জ আর ওপারে মেঘালয়ের মাইল্লাম।

বাংলাদেশ সীমান্তের এপারে বাতেরটেক ও  ডাগর গ্রাম পেরিয়ে ওপারে পৌঁছালে বালাট গ্রাম। এই গ্রামের কিছু অংশ বাংলাদেশেও ছিল। বালাট গ্রাম ধরে এগিয়ে নদী পেরোলেই লালপানি গ্রাম আর মাইল্লাম।

যেখানে বাংলাদেশের সীমানা শেষ সেখান থেকেই হরিদাসের বাড়ি শুরু।
সুনামগঞ্জ থেকে যেতে হলে বালাট হয়েই যেতে হতো। তবে বিশম্ভরপুর উপজেলার রাজাপাড়া গ্রাম থেকে যেতে হলে পথে পড়তো হরিদাসের বাড়ি। সীমান্তের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মানুষের শুধু প্রশ্ন ছিল: ‘ভাই ভারত কত দূর? বর্ডার আর কতক্ষণ?’

১৯৬৫ সালের হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা থেকে বিশম্ভরপুরের সীমান্তে চলে আসেন হরিদাস বাবু। হরিদাস ছিলেন পাক্কা ব্যবসায়ী। ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য এনে রাজাপাড়ায় বিক্রি করতেন। হরিদাসের বাড়ি ছিল দুই দেশের সীমান্তের মাঝামাঝি নো ম্যানস ল্যান্ডে।

ইপিআর এর সোর্স ছায়েদুল হক নিজেও শরণার্থী শিবিরে কাজ করতেন।
রাজাপাড়া সীমান্তের ইপিআর ক্যাম্পে ছিলেন বাংলাদেশি হাবিলদার গণি।সেখানে নায়েক ছাড়াও একজন পাকিস্তানি ছিলেন। বাঙালি ইপিআর সদস্য ছিলেন দশজন। গণি বাঙালিদের নিয়ে ক্যম্পের পাকিস্তানিদের হত্যা করেন। একইভাবে দু্ইজন পাকিস্তানিকে মেরে পাশের লাওড়ের গড়ের ইপিআর ক্যাম্পের দখলও নেন। দুটি ক্যাম্প থেকে নেওয়া অস্ত্র নিয়ে নিজে একটি দল গঠন করেন। অন্য ইপিআর সদস্যরা নিজ নিজ জেলায় ফিরে গেলেও গণি থেকে যান।

এই এলাকায় গণি জন্যে পাক বাহিনী আসারই সাহস পায়নি। আশপাশের এলাকাতেও যারাই মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বা মুক্তিদ্ধোদের সাহায্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন তাদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন। সীমান্তের এপাড়েই ২০টি রাইফেল দিয়ে ২০০ জনের মুক্তিযোদ্ধা দল গড়ে তোলেন তিনি। তবে তখন পর্যন্ত ভারত সরকার এসব মুক্তিযোদ্ধার ভারতের প্রশিক্ষণ শিবিরে যাওয়ার অনুমোদন দেয়নি। পরে জুলাই মাসে তাদের দেড়শ জনের দলকে ট্রেইনিংয়ে নেয়া হয়।

গণির কারণে এখানে পাকিস্তানি বাহিনী আসতে পারতো না। হরিদাসের বাড়িতে ছিল শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়। অনেক দূরদূরান্ত থেকে শরণার্থীরা হরিদাসের বাড়িতে আসতেন। নৌকা বা গরুর গাড়িতে উঠে বললেই হতো, হরিদাসের বাড়িতে যাবো। শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার জন্যে হরিদাসের বাড়ি হয়ে ওঠে অপেক্ষা ক্যাম্প। দিরাই, তাহিরপুর থেকে নৌকায় উঠে বললেই হতো, হরিদাসের বাড়ি পৌঁছে দেন।

নো-ম্যানস ল্যান্ডেই ছিল হরিদাসের বাড়ি।
বাংলাদেশ সীমান্তে ১২১১ নাম্বার পিলার ধরে পূর্বে নো ম্যানস ল্যান্ড। সেখানে বেল গাছটা এখনো রয়েছে। হরিদাসের বাড়ির কালী মন্দীরের পিলারগুলো এখনো চিহ্ন হিসেবে রয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪ বছরের মাথায় হরিদাসের পুরো পরিবার ভারতে চলে যায়। বড় ছেলে যুদ্ধের সময় মারা যায়।

রাজপাড়ার পাশ্ববর্তী গ্রাম ঝিমাডুয়ারের ছাত্র তখন ধীরেন্দ্র কুমার সরকার। উপজাতীয় গোষ্ঠী হাজম সম্প্রদায়ের লোক তিনি। যুদ্ধের সময়টায় যখন চারিদিক থেকে শরণার্থী আসা শুরু করে তখন গরুর গাড়ি চালানোর কাজ শুরু করেন তিনি। গরুর গাড়িতে করে তিনি নদীর পাড় থেকে মানুষকে হরিদাসের বাড়িতে নিয়ে আসতেন।বিশম্ভরপুরের পলাশ নামক স্থান থেকে প্রচুর সংখ্যক শরণার্থী এখানে নিয়ে এসেছিলেন।

হরিদাসের বাড়ির কালি মন্দিরের পিলারগুলো এখনো রয়েছে।
সীমান্তের ওপারেও রাজাপাড়া গ্রাম। সেখানেও ছিল হাজম বস্তি। নিজের পরিবারকে সেখানে রেখে এসেছিলেন তিনি। নিজে বাড়তি কিছু আয়ের জন্যে এখানে থেকে যান। বলেন, হরিদাসের বাড়ি আসলেই মানুষ ভাবতো নিরাপদ। এখানে আর পাক বাহিনীর ভয় ছিল না। আর গণি কমান্ডারের নাম শুনে সবাই নিশ্চিত ছিল।

তবে শেষ দিকে শরণার্থীদের সংখ্যা এতো বেশি হয়েছিল যে, আর গরুর গাড়িও টানা যেত না। হরিদাসের বাড়ির কয়েকশত মিটার ঘিরে শরণার্থীরা আশ্রয় নেয়। মাইল্লামে যাওয়ার সময় এখানেই তালিকায় নাম ঢোকানো হতো। কোনো ছাউনি ছিল না এখানে। খাবার বলতে মানুষ সঙ্গে করে যা নিয়ে আসতো তাই।

হরিদাসের বাড়ি ধরেই মাইল্লামে যাওয়ার পথ।
তখন পানির সমস্যা সৃষ্টি হয়। হরিদাসের বাড়িতেও অনেক শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে, বিশেষ করে ডায়রিয়ায়। মারা গেলে পরিবার আর ওই লোককে নিয়ে যেতো না। এখানেই মাটি খুঁড়ে কবর দেয়া হতো। প্রতিদিনই এখানে মৃত্যুর সংবাদ ছিল।

ভারতে গারো মোড়ল চন্দ্রকান্ত বাবুকে শরণার্থী তালিকাকরণের দায়িত্ব দেয়া হয়। চন্দ্রকান্তের তালিকায় যে পরিবারের নাম উঠতো তারাই ওই রেশন পেতো। সে বালাটেই থাকুক বা হরিদাসের বাড়িতেই থাকুক।

সুনামগঞ্জের এই এলাকার নেতা ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, তৎকালীন এমএনএ দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, আহদ্দর আলী মুক্তার, আহ্লাদ আলী মোক্তার ও  মনজুর আহমেদ। তারা সবাই মাইল্লামে থাকতেন। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, নবীগঞ্জ আর কিশোরগঞ্জের মানুষ বেশি ছিল মাইল্লাম ক্যাম্পে।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে বাতেরটেক গ্রামে গিয়ে সীমান্ত পিলারের দেখা পাওয়া যায়। সেখান থেকে  বালুরচর আর বালাট হয়ে মাইল্লামা। সেখানে বালিবাজারে শরণার্থী শিবির ঘিরে এক বিভীষিকাময় অবস্থা গড়ে উঠেছে ততদিনে। উপজাতি অধ্যুষিত এ এলাকায় বাংলাদেশিদের অবস্থান ভালোভাবে নেয়নি মেঘালয়ের মানুষেরা। বাংলাদেশের অন্য সীমান্তগুলোর তুলনায় এখানকার শরণার্থী শিবিরের অবস্থা ছিল কিছুটা ভিন্ন। এটা ছিল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাসভূমি। আর তাদের ভাষাও বাংলা ছিল না।

ধীরেন্দ্র কুমার সরকার হাজং গরুর গাড়িতে শরণার্থী নিয়ে হরিদাসের বাড়ি আসতেন। পরে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
এপ্রিলের প্রথম দিকে তখনো শরণার্থী শিবিরে কোনো তাঁবু হয়নি। বালিবাজারে পথের ধারে বসে থাকতো শরণার্থীরা। সন্ধ্যা হলে বিভিন্ন দোকান ও ঘরের সিঁড়িতে অবস্থান নিতো তারা।  তখনো ভারত সরকার থেকে এই অঞ্চলে শরণার্থী শিবির স্থাপনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের তত্ত্বাবধানে একবেলা খিচুড়ি খাওয়ানো হতো শুধু।

এদিকে সুনামগঞ্জ থেকে আসা প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যরাও খাওয়ার কষ্টে ছিলেন। তখনো ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছিল না।

মেঘালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন উপজাতীয় নৃগোষ্ঠীর বাস এই অঞ্চলে। যেখানে জনসংখ্যা কম, সেখানে কয়েক লাখ বিদেশি লোক গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বসবাস শুরু করে। প্রাকৃতিক কর্মের জন্য কোনো ব্যবস্থাই ছিল না তখন। শরণার্থীরা বাধ্য হয়ে পথের ধারে যত্রতত্র মলত্যাগ করতেন। সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় ছিলেন নারীরা। গভীর রাতে পথের ধারে বা নদীর পাড়ে প্রাকৃতিক কর্মটা সারতে হতো তাদের। স্থলে যেমন তেম্নি নদীর পানিতেও  মলমূত্র ভেসে বেড়াতো। এভাবে নোংরা-আবিল হয়ে পড়ে আশপাশের গোটা এলাকার পরিবেশ। স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয়দের অনেকে বিরক্ত হলেও মানবিক কারণে তারা তা সহ্য করে গেছেন  অকাতরে।
শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি শরণার্থী শিবিরের ক্যাম্প কমান্ডারদের কৌশল এবং উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে মোকাবেলা করতে হতো।

মে মাসের শেষ দিকে মাইল্লামের শরণার্থীদের জন্যে ৫টি বড় তাঁবু আর ৬ টি ছোট তাঁবু আসে। একটি বড় তাঁবুতে আশি থেকে একশো পরিবার বাস করতে পারতো। ছোট তাঁবুতে তার অর্ধেক। একটি ছোট তাঁবুতে গুদামঘর বানানো হয়। সেখানে রেশনের মাল এলে জমা করা হতো।

বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে রাজাপাড়ার মুক্তিযোদ্ধারা।
মাইল্লামে মে মাসেই ঠাণ্ডা আবহাওয়া ছিল। সকলের জন্যে তিনটি কম্বল ছিল। একটি বালিশ হিসেবে ব্যবহৃত হত। একটি খড় বা পাতার উপরে বিছিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হতো। আরেকটি গায়ে দেয়ার জন্যে। ৪ থেকে ৫ হাজার টিনের প্লেট, ২ হাজারের মতো গ্লাস আসে। সেখানে কমন খাবার ছিল বুটের ডাল। এছাড়াও রেশনের চাল আর বিড়ি রাখা হতো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে।

ক্যাম্পে ছিলেন কিশোরগঞ্জের এক হোটেলের বাবুর্চি। তিনি রান্নার দায়িত্ব নেন। তাকে সাহায্য করার জন্যে কয়েকজনকে নিয়ে ভলান্টিয়ার টিম গঠন করা হয়।

ভারতে শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার পথে বাংলাদেশের ভেতরে দুর্বৃত্তরা অনেক সময় শরণার্থীদের সর্বস্ব কেড়ে নিতো। এরকম দুজন লুটেরাকে একবার শরণার্থীরা আটক করে পিটিয়ে মেরে ফেলেন।

শরণার্থী শিবিরে বিবাদ মেটানো এবং মালের হিসেব রাখা ও বণ্টনের জন্যে জনৈক শফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি জানান, সেখানে চুরির ঘটনাও ঘটতো।
একসময় শরণার্থী শিবিরে একটি ইয়ুথ টিম গঠন করা হয়। সেখানে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে রিক্রুট করা হতো যুবকদের। একটি সরকারি ফর্মের নিচে কার্বন কপি দিয়ে তার নকল করা হতো। এবং যারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাইতো, তারা ওই ফর্ম পূরণ করতো।

তিনি বলেন, শরণার্থী শিবিরের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ছিলেন নারীরা। শরণার্থী শিবিরের কমান্ডারদের এদিকটায়ও নজর রাখতে হতো।
সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন...
** 'বিলোনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ' ইতিহাসে যার তুলনা বিরল
** রামগড় ট্রানজিট ধরে রাখতে মরণপণ যুদ্ধ

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৬
এমএন/জেএম

যারা বর্ণনা দিয়েছেন:

বিশ্বম্ভরপুরের মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী ছায়েদুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্র কুমার সরকার হাজং, মুক্তিযোদ্ধা আতর আলী, সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবু সুফিয়ান ও মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী শফিকুল ইসলাম।

পিলখানা ট্রাজেডির ৯ বছর
সাতক্ষীরায় দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে হেলপার নিহত
রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে মিনুর পাশে লিটন
বরিশালে আলু বোঝাই ট্রাক উল্টে খাদে
আশুলিয়ায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার
সৈয়দপুরে আবাদি জমিতে গড়ে উঠছে ইটভাটা
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হ্যারিসনের জন্ম
প্রেমে ভুল বোঝাবুঝি মিথুনের, রাগ সামলান সিংহ
যতো ভালোবাসা গম্ভীরায়
ট্রেনের ছাদে ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত




Alexa