মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম, স্টাফ ফটো করেসপন্ডেন্ট

যে পিচঢালা পথ ধরে থপ থপ পা ফেলে গলা উঁচিয়ে রাজসিক রাজহাঁসের দল হাঁটছিলো, সে পথেই একদিন চলেছে হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত যুদ্ধট্যাংক।

যশোর: যে পিচঢালা পথ ধরে থপ থপ পা ফেলে গলা উঁচিয়ে রাজসিক রাজহাঁসের দল হাঁটছিলো, সে পথেই একদিন চলেছে হানাদার পাকিস্তানি সেনাদের যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত যুদ্ধট্যাংক। বুকের কাছে রাইফেল নিয়ে ‘ইয়া আলী’ বলে রক্ত ঝরিয়েছে স্বাধীনচেতা বাঙালির। হাঁসগুলোর রাজসিক ভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল এখন তারা স্বাধীন দেশের। এই সড়ক ধরে ঠিক উল্টো দিক থেকে ঢুকেছিল মিত্রবাহিনীর ট্যাংক ও পদাতিক বাহিনী। সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের গেরিলা বাহিনী। সম্মুখযুদ্ধের শেষ মহারণটি হয় সড়কের পাশের স্কুলমাঠটিতে (তৎকালীন সময়ের আমবাগান)। যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় মল্লযুদ্ধে।


তৎকালীন জগন্নাথপুরে (বর্তমানে মুক্তিনগর) এটি ছিল মূল যুদ্ধক্ষেত্র। যে আম্রকাননে  যুদ্ধ হয়, সেটি এখন মুক্তিনগর শহীদ সরণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ।

গ্রামটির নাম তখন জগন্নাথপুর। দেশের প্রথম জেলা যশোরের চৌগাছা সীমান্ত-উপজেলার সিংহঝুলি ইউনিয়ন। ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বয়রা, লক্ষ্মীপুর। এপারে কাবিলপুর, জামতলা, ছুটিপুর, ধুলিয়ানি ও গরিবপুর। একাত্তরের ২১ নভেম্বর। ঈদের দিন। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে গরিবপুর, জামতলা, জগন্নাথপুর এসে অবস্থান নিল শত শত পাকিস্তানি সৈন্য। পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে বিধ্বংসী ট্যাংক। উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি চৌগাছা দখল নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করা। মেজর এম এ মনজুরের অধীন ৮ নম্বর সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টর কমান্ডার তখন ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা। যিনি ‘ক্যাপ্টেন হুদা’ নামেই বেশি পরিচিত।


জগন্নাথপুর, যুদ্ধদিনের ছবি। তুলেছিলেন যশোরের আলোকচিত্রী এসএম শফি। চৌগাছা মুক্তিযুদ্ধ কমান্ডার অফিসে টাঙানো ছবি থেকে ছবি তোলা।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মিত্র হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অনেকটাই সম্মত তখন। জগন্নাথপুর সীমান্ত এলাকা। তাই মিত্রবাহিনীর ঢুকে পড়াটাও ছিল সহজ। মাসের পর মাস বিহারে ট্রেনিং করা গেরিলাযোদ্ধাদের নিয়ে প্রস্তুত ছিল মিত্র বাহিনীও। যেদিক দিয়ে মিত্রবাহিনী ঢুকেছিল, ঠিক সেই সীমান্তপথে গিয়ে দেখা গেল সেখানে কাঁটাতারের বেড়া। ধানের গন্ধমাখা মাঠ দিয়ে ফুট চারেক চওড়া একটি মেঠো সড়ক চলে গেছে সীমান্ত পর্যন্ত। তখন আরও নিচু, দুর্গম সে-পথ দিয়ে বাওড়, মাঠ পেরিয়ে জগন্নাথপুর ঢোকে মিত্রবাহিনী।

****চৌগাছা যুদ্ধের আরও ছবি দেখতে ক্লিক করুন এখানে

জগন্নাথপুরের আশপাশের অধিকাংশ গ্রাম আগেই জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানিরা। সেদিন ঈদ ছিলো শুধু নামাজেই সীমাবদ্ধ। সন্ধ্যা থেকেই বেড়ে গেল তোড়জোড়। প্রায় মানুষশূন্য গ্রামে তখন যে ক’টি ঘরে লোকজন ছিল, তাদের না মেরে ‘এ ধারসে ভাগ যা’ বলে সরে যেতে বলে খান সেনারা। কেন জানি মারতে উদ্যত হয়নি। গরিবপুর ও জগন্নাথপুরের পুকুরপাড়, বিল ও আম্রকাননে অ্যাম্বুশ নেয় তারা।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার বয়রা থেকে কাবিলপুর দিয়ে পশ্চিম-দক্ষিণ কোণ থেকে গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক নিয়ে হাজির হয় মিত্রবাহিনী। দুটি শিখ লাইট আর্টিলারি রেজিমেন্ট, কাশ্মীর রেজিমেন্ট ও একটি শক্তিশালী ট্যাংক রেজিমেন্ট ছিল বহরে।

এদিক দিয়ে আক্রমণে এসেছিল মুক্তিযোদ্ধারা। এ ধানক্ষেতে বিধ্বস্ত করা হয় দুটি পাকিস্তানি ট্যাংক। দেখাচ্ছেন সে যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধা ও ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দারা।

যে আম্রকাননে মূল যুদ্ধ হয়, সেটি এখন মুক্তিনগর শহীদ সরণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। যুদ্ধের সময় ছিল বড় বড় আমগাছের বাগান। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা একজোট হয়ে আসে ঈদের দিন দুপুর নাগাদ। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। কপোতাক্ষ নদ ও ঢেঁকিপোতা বাওড় পেরিয়ে আসা মিত্র বাহিনীর ট্যাংকের মুখোমুখি হয় গরিবপুর থেকে আসা পাকিস্তানি ট্যাংক। চলে অনবরত গোলাগুলি। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিলো হাজারের বেশি। পাকিস্তানিদের সঠিক সংখ্যা না জানা গেলেও এর চেয়ে বেশি ছিল বলেই ধারণা।

মাঠ পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের ধানখেতে বিধ্বস্ত হয় পাকিস্তানিদের দুটি ট্যাংক। একটি মুক্তিবাহিনীর পোঁতা মাইনে, অন্যটি মিত্র বাহিনীর আর্টিলারি শেলে। শেলে চেইন কেটে যাওয়া ট্যাংকটি পড়েছিলো কয়েক দিন। পচা লাশের গন্ধে ভরে ছিল সেই জায়গা এখন ধানের গন্ধে মাতোয়ারা। সড়কটিও হয়েছে মাটি থেকে পিচঢালাই।

এদিন শেলের টুকরো পড়ে নিহত হন মুক্তিনগর শহীদ সরণি স্কুলের শিক্ষক শাজাহানের দাদি। সেদিন এতো মানুষ মারা গিয়েছিল যে, কাউকেই কবর দেওয়া যায়নি। সেসময় কুকুর আর শিয়ালের উৎপাত ছিলো বেশি। সব লাশ যায় তাদেরই পেটে।


ভারতের বয়রা সীমান্ত। এদিক দিয়েই ঢুকেছিলেন মিত্রবাহিনীর সদস্যরা। চৌগাছা উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি কমান্ডার মো. কিতাব আলী বলছিলেন সেটাই।

প্রথমে ট্যাংক থেকে ট্যাংকে গুলি, মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু হলেও একসময় ট্যাংগুলো এতো কাছাকাছি এসে যায় যে, আর সামনে এগিয়ে গুলি ছোড়া সম্ভব ছিল না। দু’পক্ষের সৈন্যরা একসময় কাছাকাছি চলে এলে গুলি ছোড়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তাতে নিজেদের লোক চিহ্নিত করে শত্রুপক্ষকে গুলি করা কঠিন হয়ে ওঠে। একসময় বেয়নেট দিয়ে চলতে থাকে যুদ্ধ। সবশেষ যখন আরও মুখোমুখি হলো তখন বেয়নেট ফেলে হাতাহাতি, চুলোচুলি পর্যন্ত হয়। এমন যুদ্ধের নজির দেশে কমই আছে। আর হলেও এতো বড় আকারে নয়।

যুদ্ধের একসময় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করতে বললে তারা জানায়, ‘এক রাউন্ড গুলি আভি বাকি হে’। এভাবে তারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যায়। টানা যুদ্ধের পর শেষ দিকে বিমান হামলায়ও যখন রক্ষা না হয়, তখন পিছু হটে ক্যান্টনমেন্ট না ঢুকে বারোবাজার হয়ে খুলনার শিরোমনিতে পালিয়ে যায় পাকিস্তানিরা। ২২ নভেম্বর জগন্নাথপুর ওঠে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য।

ইজারুল, শাজাহান, আইয়ুব হোসেন ২২ তারিখ এসে দেখেন দুটি ট্যাংক পড়ে আছে। গায়ে লেখা ‘ইউএসএ’। চারদিকে লাশ আর লাশ। মিত্রবাহিনীর অনেকের লাশও ছিল এর মধ্যে। কিছু ট্যাংক আর মৃত সৈন্যকে তারা নিয়ে যায় যুদ্ধের দিনই।

বয়রার যে সীমান্ত দিয়ে মিত্রবাহিনী সেদিন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুদ্ধ করেছিল, সেই সীমান্তে এখন কাঁটাতারের বেড়া। যুদ্ধের সময় বয়রা থেকে জগন্নাথপুর পর্যন্ত ছিল পানি আর পানি। আর ঐতিহাসিক জগন্নাথপুরের সেই আম্রকানন এখন মুক্তিনগর শহীদ সরণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। সেখানে একটি ছোট স্মৃতিফলক আছে মাত্র। আম গাছ কেটে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় স্কুল। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মহিউদ্দীন খান আলমগীর স্মৃতিফলকটি উদ্বোধন করেন। আর গ্রামটির নাম দেন মুক্তিনগর।
 
কপোতাক্ষপাড়ে বধ্যভূমি, পাকিস্তানিদের ‘প্রমোদ বাড়ি’
এই মুক্তিনগর থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে কপোতাক্ষের মিষ্টি পানি লোনা হয়েছিল একবারই। সেটা ১৯৭১-এ। শত শত বাঙালির রক্তে। নদের পানিতে সেদিন বয়েছিল রক্তের জোয়ার। চৌগাছাকে সাপের মতো জড়িয়ে থাকা কপোতাক্ষ নদের ঠিক উত্তর পাড়ের উঁচু টিলায় ছিলো ব্রিটিশ শোষণের চিহ্নবাহী জমিদার হেমচন্দ্রের একটি ভবন। ১৯৬২ সালে কিছুটা সংস্কার করা ৬০ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত সে ভবন এখন উপজেলা ডাকবাংলো হিসেবে ব্যবহৃত।


ব্রিটিশ শোষণের চিহ্নবাহী জমিদার হেমচন্দ্রের একটি ভবনটি এখন উপজেলা ডাকবাংলো। আর্টিলারি শেলের দাগ মুছে গেছে ভবনটির শরীর থেকে।

এটা ছিল পাকিস্তানি খান সেনাদের ঘাঁটি। অবশ্য ঘাঁটি না বলে একে সবাই বলতো ‘প্রমোদ বাড়ি’। কারণ তাদের প্রধান কাজ ছিল রাজাকারদের মাধ্যমে বাঙালি নারীদের এখানে ধরে নিয়ে এসে আমোদ-ফূর্তি করা। অফিসাররা থাকতেন ভবনের ভিতরের তিনটি কক্ষে। আর সৈন্যরা থাকতো বাইরে তাঁবু, বাংকার খুঁড়ে।

বাংকারগুলো খোঁড়া হতো বাঙালিদের দিয়ে। মুক্তিযোদ্ধা কিংবা স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের মেরে এই নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। সেখানে ছোট একটি জামগাছ ছিল নদীর পাড়ে, বাড়িটির পাশে। গাছটি এখন অবশ্য অনেক বড়। যেন মাটির নিচে থাকা অসংখ্য সূর্যসন্তানকে ছায়া দিয়ে রেখেছে প্রশান্তিতে। এই জামগাছের নিচের পুরো জায়গাটায় নদীর পাড়জুড়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। তখন ভবনটির তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন বারিক সরদার।
তার নাতি জিকো দাদার কাছে শুনেছেন এখানে অনেক জঙ্গল ছিল। পাঞ্জাবিরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে এনে এখানে মেরে গণকবর দিতো। কখনও নদীতে ছুড়ে ফেলে দিতো। নারীদের এনে অত্যাচার করতো।

যুদ্ধাবস্থায় ভগ্ন বর্তমান ডাকবাংলো। ছবিটি তুলেছিলেন যশোরের আলোকচিত্রী এসএম শফি। চৌগাছা মুক্তিযুদ্ধ কমান্ডার অফিসে টাঙানো ছবি থেকে ছবি তোলা।

মে মাসের দিকে ঘাঁটি করা হয় এখানে। এটা ছিলো এ অঞ্চলে তাদের প্রধান ঘাঁটি। পাশের এ নদে তারা স্পিডবোট নিয়ে চলাচল করতো। নভেম্বর মাসে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যৌথ আক্রমণে তারা পালাতে বাধ্য হয়। শেলে উড়ে যায় ভবনের একাংশ। যদিও পরে আবার সংস্কার করা হয়েছে। বিধ্বস্ত সে ভবনের ছবি তুলেছিলেন চিত্রগ্রাহক এসএম শফি। সেদিন জগন্নাথপুরের সে মল্লযুদ্ধের ছবিও রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড অফিসে।
 
যারা ঘটনা বর্ণনা করেছেন:
১. বিহারে গেরিলা ট্রেনিং নেওয়া চৌগাছা উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি কমান্ডার মো. কিতাব আলী
২. উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মো. শাজাহান কবির।
৩. প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিনগর শহীদ সরণি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ইজারুল ইসলাম ও শাজাহান আলী।

সহযোগিতায়:  

বাংলাদেশ সময়: ০০০১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০১, ২০১৬
এএ/জেএম

** ডিসেম্বরের প্রথম থেকে বাংলানিউজে ‘রণাঙ্গনের এপার-ওপার’

ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
‘ছাত্রলীগ’ পরিচয় দিয়ে কেড়ে নিল আইনজীবীর মোবাইল-টাকা
কলমের খোঁচায় ১০ বছরের শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়ে যাবে?
চবি প্রশাসন দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে
লালদীঘিতে ২৬ ফেব্রুয়ারি মহিউদ্দিনের স্মরণসভা
যশোরের আকাশে ডানা মেলেছে রিজেন্ট
যেসব যুক্তিতে আপিল করেছেন খালেদা
ভারতে পাচার ১০ শিশুকে বেনাপোলে হস্তান্তর 
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই জাপার জন্ম 
কুর্দি-নিয়ন্ত্রিত ছিটমহলে আসাদ সমর্থক বাহিনী




Alexa