দিয়াজের ময়না তদন্তের ময়না তদন্ত

অধ্যাপক ড. (ডা.) মোহাম্মদ নাসিমুল ইসলাম, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

নিহত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধ‍ুরী (ফাইল ফটো)

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধ‍ুরীর দু’টি ময়না তদন্তের প্রতিবেদন দেখে বাংলাদেশের ফরেনসিক বিষয়টির বিজ্ঞান ভিত্তিটাকে বড়ই নড়বড়ে মনে হচ্ছে। দিয়াজ আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে- সেটি নির্ণয়ে একই মৃতদেহের ওপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক)  হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ দু’বার ময়না তদন্ত করে দু’ধরনের প্রতিবেদন দিয়েছে।

প্রথমটিতে আত্মহত্যা বলা হলেও দ্বিতীয়টিতে বলা হচ্ছে, দিয়াজকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

ময়না তদন্ত প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির সঠিকতা বোঝা যায় পুনঃপুনঃ পরীক্ষায় একই ফলাফল প্রাপ্তিতে। ফলে পরস্পরবিরোধী এ প্রতিবেদন দেশের মেডিকোলিগ্যাল ব্যবস্থার দৈন্যতাকে আবারও উন্মোচিত করেছে।

গত বছরের ২১ নভেম্বর দেওয়া চমেকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘Death in my opinion was due to asphyxia as a result of hanging, which was antemortem in nature. The ligature mark and other circumstantial evidences are consistent with suicidal hanging.’

একই বছরের ১১ ডিসেম্বর দেওয়া ঢামেকের প্রতিবেদনে বলা আছে-‘Opinion regarding cause of death kept pending till receipt of chemical analysis and histopathology report.’

এর ৮ দিন পর ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের দেওয়া হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদনে বলা আছে- ‘Complete autolytic change.’

Chemical analysis report আমি না দেখলেও নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সেখানে বিষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বা অনুরুপ কিছু লেখা আছে।

গত ২৯ জুলাই সবকিছু বিবেচনায় এনে ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা আছে- ‘Opinion: Considering post-mortem examination findings, chemical analysis report, Histopathological report, Previous Postmortem and inquest report, findings obtained from crime scene visit and photograph of the dead body (supplied by police), we are of the opinion that death was due to asphyxia resulting from hanging followed by coma due to above mentioned injuries (PM report) which were ante mortem and Homicidal in nature.’

প্রথম ময়না তদন্ত প্রতিবেদন অনেক গোছানো হলেও ডাবলুএইচও’র প্রথা কোনো ক্ষেত্রেই মানা হয়নি।

দ্বিতীয় প্রতিবেদনটিতে দৃশ্যত চমক থাকলেও স্ববিরোধিতা আছে। হ্যাংগিং (শ্বাসরোধ ) লেখার পর তাকে আর হত্যা বলার কোনো সুযোগ থাকে না। হ্যাংগিং পরবর্তী কমা তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ। এখানে হ্যাংগিং এর স্থানে lynching লেখা হলে তারও ন্যায্যতা দিতে হবে। রক্তে থাকবে ড্রাগের নমূনা বা হাত পা বাধা। সংরক্ষিত নয় এমন অপরাধস্থল ৩/৪ সপ্তাহ পর ভিজিট করে আলামত সংগ্রহ করা যায়- তা আমার মতো অনেক ফরেনসিক প্যাথলজিস্টই মানবেন না।

যেহেতু এটি দ্বিতীয়বারের ময়না তদন্ত, তাই শুধু পুলিশি শনাক্তের ওপর পুরোপুরি আস্থা না রেখে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতেও শনাক্ত করা ছিল অপরিহার্য। এটি মাথায় রেখেই মোলার দাঁত পাঠানো হয়েছে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য। অথচ প্রতিবেদনে সেটিরই ফলাফল উল্লেখ নেই!

আবার প্রথম প্রতিবেদনে শুধুমাত্র শ্বাসরোধ (asphyxia) বলা হলেও দ্বিতীয় প্রতিবেদনে শ্বাসরোধের সঙ্গে সংজ্ঞাহীনতা (coma) জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত জখম বা তথ্যগুলো পর্যালোচনা করলে সুরতহাল ও উভয় ময়না তদন্তের জখমের বৈসাদৃশ্য দেখা যায়, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

যেহেতু নন মেডিকেল ব্যক্তি ‘পুলিশ’ সুরতহাল প্রতিবেদনে প্রস্তুত করেছেন, সেখানে ভুল মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ফরেনসিকের স্বনামধন্য ডাক্তাররা যেভাবে জখম শনাক্তে ভুল করলেন, তা কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সময়ের ব্যবধানে জখম শনাক্ত দুরূহ হয়ে পড়লেও অনেক জখম আছে প্রথম ময়না তদন্তে না হলেও দ্বিতীয় ময়না তদন্তে দৃশ্যমান হয়েছে। যা ন্যূনতম ফরেনসিক জ্ঞানধারীদের হতবাক করবে। উভয় ময়না তদন্তে জখমগুলোর বৈসাদৃশ্য দূর করতে প্রথম ময়না তদন্তকারীদের অথবা তাদের দলনেতাকে দ্বিতীয় ময়না তদন্ত চলাকালে উপস্থিত রাখা বাঞ্ছনীয় ছিল।

বিষজনিত মৃত্যুকে শনাক্তে মৃতদেহের ভিসেরা/অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। যেহেতু প্রতিবেদনটিতে তা সংযুক্ত করা হয়নি, তাই ধরে নেওয়া যায়, সেখানে বিষের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। থাকলে মৃত্যুর কারণটাই হয়তো বদলে যেত।

ঢামেক হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের দেওয়া হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদনে বলা আছে, Complete autolytic change অর্থাৎ সেখানে পাঠানো স্যাম্পল পরিপূর্ণভাবে পচে গিয়েছিল। যা থেকে কোনো মতামত দেওয়া সম্ভব নয়।

আবার প্রথম ময়না তদন্তে ঘটনাস্থল পরীক্ষা করা হয়েছিল কি-না অথবা তার ফলাফল কি ছিল কিছুই উল্লেখ নেই। যদি প্রথম ময়না তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরীক্ষা না করে থাকেন, তার কৈফিয়ত চাওয়া যেতে পারে। ঘটনাস্থল সংরক্ষিত না থাকলে দ্বিতীয় ময়না তদন্তকারী দলের ঘটনাস্থল পরীক্ষা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়।

দ্বিতীয় ময়না তদন্তে শ্বাসরোধ (asphyxia) ও সংজ্ঞাহীনতা (coma) নির্ণয়ে পরীক্ষা কি যথাযথ বা পর্যাপ্ত ছিল? পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শ্বাসরোধ (asphyxia) ও সংজ্ঞাহীনতা (coma) আমলে নিয়ে কি মৃত্যুর ধরণকে হত্যা বলা যায়? না, কোনোভাবেই বলা যায় না। নড়বড়ে ঠুনকো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম ময়না তদন্ত প্রতিবেদনকে অবহেলা করা কোনোভাবেই সমীচীন হয়নি!

দ্বিতীয় ময়না তদন্ত দুরুহ কাজ। সেখানে শুধু আলামত দিয়ে পার পাওয়া যাবে না অকাট্য প্রমাণ দিয়ে প্রথম ময়না তদন্ত প্রতিবেদনকে খণ্ডন করতে হবে।

একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, দ্বিতীয় প্রতিবেদনে এমন কিছু রয়েছে যা মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ময়না তদন্ত প্রতিবেদনের বিজ্ঞান ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সুতরাং, দিয়াজের মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনে ফের দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

লেখক: প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। বর্তমানে অধ্যাপক ও সিনিয়র ফরেনসিক কনসালট্যান্ট, ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মারা, মালয়েশিয়া, nasimevu@yahoo.com

বাংলাদেশ সময়: ১৮২০ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৬, ২০১৭
এএসআর

উত্তরায় দেয়াল ভেঙে নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু
বন্দরনগরীর পুঁজিবাজার মেলার প্রচরণা শুরু 
ইথিওপিয়ার বিরোধী নেতা মেরেরাসহ ৫০০ জন কারামুক্ত
নারীর কোলে নিথর শিশু, ডিএনএ টেস্টে মিলবে পরিচয় ?
ফেলানী হত্যায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত
ঈশ্বরদীতে চোলাই মদসহ ৩ মাদক বিক্রেতা আটক
জাতীয় পার্টির যৌথসভা সোমবার
কৃষি জমির মাটি ইট ভাটায়, আড়াই লাখ টাকা জরিমানা
ক্যাপিটাল এফএম ৯৪.৮ এ 'ভালোবাসা With গুরু এহতেশাম'
বডি শেপিংয়ে জন্য ফ্যাটএক্স




Alexa