মৌসুমীর সঙ্গে কিছুক্ষণ

যৌথ প্রযোজনা হয়তো শখের ব্যাপার!

সোমেশ্বর অলি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

মৌসুমী, ছবি: রাজীন চৌধুরী-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী মৌসুমীর ক্যারিয়ার পড়লো দুই যুগে। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে শুরু, এতো বছর পেরিয়েও তিনি ব্যস্ত সময় কাটান শুটিংয়ে।

মৌসুমী এখন বেছে বেছে কাজ করছেন চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকে। একটি টিভি নাটকের দৃশ্যধারণের ফাঁকে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। পড়ুন তার সাক্ষাৎকার—

বাংলানিউজ: অাপনার সময়ের অনেকেই বড়পর্দায় নেই। আপনি এখনও অভিনয়ে মোটামুটি নিয়মিত। নবীনদের পরিচালনায়ও কাজ করছেন। কোন কাজটা করবেন- এটা নির্বাচন করতে নিশ্চয়ই বেগ পেতে হয়?
মৌসুমী:
যাদের পরিচালনায় কাজ করতাম, তারা অনেক বরেণ্য ও গুণী নির্মাতা। তাদের অনেকেই এখন আর কাজ করছেন না। এমনকি প্রযোজকরাও অনেকে সরে গেছেন। এ অবস্থায় আমি যদি নিজেকে গুটিয়ে রাখি, তা ঠিক হবে না। এজন্য নতুনদের সঙ্গে কাজ করছি। কেউ যদি ভালো একটি গল্প নিয়ে এসে অভিনয়ের প্রস্তাব দেয় বা পরামর্শ চায় তাহলে তার মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা ধরার চেষ্টা করে ভাবি সে কেনো কাজটি করতে চায়। ভালো লাগলে অভিনয়ে রাজি হই।

মৌসুমী, ছবি: রাজীন চৌধুরী-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমবাংলানিউজ: সব কাজ নিয়ে ইতিবাচক সাড়া পান? মানে, তারা যে ধরনের কথা বলে আপনাকে রাজি করায় ছবিটা কী শেষ পর্যন্ত আপনার প্রত্যাশামাফিক হয়?
মৌসুমী:
নতুন ছেলেরা কাজটি গুরুত্ব দিয়ে শুরু করে। কিন্তু কেউ কেউ পারে, কেউ কেউ ব্যর্থ হয়। এর মূল কারণটা বের করেছি। অনেক সময় এরা ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না। একটি নাটক হয়তো সে ঠিকঠাক নামিয়ে আনতে পারে। কিন্তু চলচ্চিত্র বিশাল ব্যাপার। এটাই তার আসল পরীক্ষার জায়গা। সত্যি বলতে, চলচ্চিত্রের পঞ্চাশ ভাগ কাজ হওয়ার পর থেকে পরিচালক ও প্রযোজকের ধৈর্য কমতে থাকে। এরপর সংশ্লিষ্টরা কোনোভাবে ছবিটা মুক্তি দিতে পারলেই যেন বাঁচেন! তারা আপস করতে থাকেন। এ কারণেই ছবি শেষ অবধি ভালো হয় না।  

বাংলানিউজ: ‘লিডার’, ‘রাত্রির যাত্রী’র মতো আপনার কয়েকটি ছবি মুক্তির অপেক্ষায় আছে। এগুলোর কাজ নিয়ে কী বলবেন?
মৌসুমী:
‘লিডার’-এর গল্পটাতে যথেষ্ট ব্যাপকতা আর কাজ করার সুযোগও ছিলো। পরিচালক হয়তো নানারকম সীমাবদ্ধতার কারণেই পারেননি। এ অবস্থায় তিনি হয়তো ছবিটাকে অন্যরকমভাবে শেষ করছেন। দর্শকের কাছে কতোটা ভালো লাগবে কে জানে! আর ‘রাত্রীর যাত্রী’র পরিচালক চেষ্টা করছেন কোনোভাবে ছবিটার কাজ শেষ হোক। পরে দেখা যাবে নতুন কিছু করতে হবে কি-না। একেক পরিচালকের কাজের ধরন আসলে একেক রকম। সেটা ধৈর্য বা আগ্রহের ওপর নির্ভর করে। আবার অনেকের বেলায় একটা কাজের মাঝামাঝি অন্য ছবি পেলে আগের ছবিটার প্রতি মায়াটা থাকে না। তাই আমি মনে করি, এ অবস্থায় নতুন কাজে হাত দেওয়া উচিত নয়।

বাংলানিউজ: চলচ্চিত্রের সার্বিক অবস্থা কেমন মনে হয়?
মৌসুমী:
আমরা যারা সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখছি না, তাদের ভাবা উচিত না কেনো ভালো ছবি হচ্ছে না। ছবি দেখলেই না বোঝা যাবে প্রকৃত অবস্থাটা কী। কিছু ছবি ব্যবসা করছে। ছবি চলছে না- এটা এক ধরনের কথা। আবার ব্যবসাসফল হওয়ার সুযোগ ছিলো কিন্তু ফ্লপ করলো সেটা অন্যকথা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকতে পারে, দুর্যোগও থাকতে পারে। ভালো ছবি ব্যর্থ হওয়ার আর তো কোনো কারণ দেখি না! তবে অখাদ্য জিনিস ব্যবসা করবে- এটা আশা করা ঠিকও না। এর মানে, আমাদের দেখা ও বিশ্লেষণের মধ্যে ভুল রয়ে যাচ্ছে। আমাদের এখানে অল্প টাকায় অনেক ভালো ছবি হচ্ছে, ব্যবসা করছে। আবার বড় বাজেটের ছবিও ব্যবসা করছে।  
 
মৌসুমী, ছবি: রাজীন চৌধুরী-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমবাংলানিউজ: এখন বড় বাজেটের ছবি মানেই কলকাতার সঙ্গে যৌথ প্রযোজনা। এখানে শিল্পী-কলাকুশলী ভাগাভাগি হচ্ছে। দর্শক হয়তো বাড়ছে, কিন্তু ছবি ব্যর্থও হচ্ছে। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
মৌসুমী:
কিছু বিষয়ে গোলকধাঁধা থাকা উচিত। এগুলো বড় বড় ব্যাপার। এসব নিয়ে জনসমক্ষে আলোচনা না করাই ভালো। এখন আমার একটা কথার কারণে এসব প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আমি চাই না একজন প্রযোজকের খারাপ হোক। যৌথ প্রযোজনা কারও কারও শখের ব্যাপার হতে পারে। হয় না? আমি লোকসান দিয়ে হলেও বানাবো (হাসি)। এখানে একটা হিসাব নিশ্চয়ই আছে। দুই দেশের শিল্পীর কারণে অন্তত দুটি মার্কেট তারা পাচ্ছেন। তবে কোনো প্রজেক্ট ব্যর্থ হবে না এমন কেউ বলতে পারে না।

বাংলানিউজ: গত বছরের আলোচিত ছবি ‘আয়নাবাজি’। বিভিন্ন কারণেই ছবিটি নিয়ে আমরা কথা বলতে পারি। আপনি কিছু বলবেন?
মৌসুমী:
অমিতাভ রেজার সবকিছু হিসেব করা ছিলো। ক্রিয়েটিভ একটা জায়গা থেকে স্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়েছে। মার্কেটিংয়েও তারা সফল। ছবিটি দেখতে দেখতে আমার বারবারই মনে হচ্ছিলো যে, কোনো একটা কাস্টিংয়ে কী অমিতাভ ভুল করলেন? না সেটা হয়নি। আমার মতো অনেকেই এটা ভেবেছেন হয়তো। চঞ্চলের (চৌধুরী) মতো একজন ভালো অভিনেতার সঙ্গে একটা আনাড়ি নাবিলাকে (আমাদের কাছে অনেক সুইট-কিউট একটা মেয়ে) দর্শক নেবে তো? নাবিলা যদি চঞ্চলের সমান্তরাল অভিনয় না করতে পারেন! তাহলে তো গল্পটাই মার খাবে! কিন্তু দর্শক ছবিটি দেখেছে।

এর আগে সেলিম ভাই (গিয়াস উদ্দিন সেলিম) গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সাধারণ একটি গল্প নিয়ে ছবি (মনপুরা) বানিয়ে সফল হয়েছেন। আমার মতে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি ছবি ভালো লাগতে হবে। শুরুতেই যদি দর্শকের ভালো না লাগে, মাঝখানে যদি কোনো কারণে মায়ায় না পড়ে যায় এবং শেষ মুহূর্তে যদি দর্শক কিছু একটা নিয়ে বের না হতে পারে- তাহলে ছবি কখনও হিট হয় না। এটা তো সহজ হিসেব। আমার মনে হয়, যারা এই সহজ হিসেবটি মেলাতে পারেন, তারাই সফল।

মৌসুমী, ছবি: রাজীন চৌধুরী-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম।বাংলানিউজ: কাজী হায়াতের ‘ঘুম’ নামের ছবিতে আপনি অভিনয় করছেন। এটা কেমন হবে বলে মনে করছেন?
মৌসুমী:
এখনও চুক্তিবদ্ধ হইনি। তাই এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ‘ঘুম’-এর প্লট আমার বেশ ভালো লেগেছে।

বাংলানিউজ: এ সময়ে নায়ক-নায়িকাদের কেমন মনে হয়? আপনার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের তুলনায় এখন অনেকে এসে ঝরে পড়ছে। এর কারণ কী?
মৌসুমী:
এখানেও ধৈর্যের বিষয়টি যুক্ত। তিন-চার বছর কোনোরকম যাওয়ার পর একটা বাচ্চা মেয়ে বা ছেলের পক্ষে এই কষ্টের জীবন সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। যদি সার্বিকভাবে সহযোগিতা না পাওয়া যায় তাহলে সে আটকে যায় চারপাশ থেকে। তখন তার স্পেস দরকার হয়। তখন তাকে বাধ্য হয়ে অভিনয় ছেড়ে চলে যেতে হয় বা ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা সে মাদক নেওয়া শুরু করে। দুঃখজনক হলো, চলচ্চিত্রে একবার কেউ পা পিছলে পড়লে আর উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না।   

বাংলানিউজ: নবাগতদের জন্য কোনো পরামর্শ দিতে চান?
মৌসুমী:
ক্যারিয়ার গঠনের জন্য কাজটাই বড় কথা। এমন কোনো দুর্নীতি করা যাবে না যার জন্য পরে জবাবদিহি করতে হয়। কোনো প্রকার পলিটিক্সে জড়ানো যাবে না। আবার তারকা হয়ে গেলে নিজের নামের অপব্যবহার যেন না হয়। জনপ্রিয় নামকে দুইভাবে ব্যবহার করা যায়, ভালো ও মন্দ। শিল্পীদের কেউ কেউ সামাজিক কাজ করেন, আবার অনেকে খারাপ কাজও করে।

মৌসুমী, ছবি: রাজীন চৌধুরী-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমবাংলানিউজ: চলচ্চিত্র প্রযোজনা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন...
মৌসুমী:
আমার পক্ষে এই বড় দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, আমার স্বামী (ওমর সানী) ও ছেলে (ফারদিন এহসান স্বাধীন) যদি মনে করে তাহলে তাদের সঙ্গে থাকবো। সত্যি বলতে নিয়মিত ছবি প্রযোজনার ইচ্ছে নেই।

বাংলানিউজ: আপনি নিয়মিত ছবি প্রযোজনা করলে চলচ্চিত্র শিল্পের নিশ্চয়ই ‍উপকার হবে…
মৌসুমী:
সেটা ঠিক। কিন্তু অন্যভাবে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে আছি, থাকতে চাই। এই যেমন ধরেন, নতুন পরিচালকের ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে হোক, তার কাছ থেকে কম পারিশ্রমিক নিয়ে হোক, তাকে পরামর্শ দিয়ে হোক- আমি চলচ্চিত্র শিল্পে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ সময়: ১৮৩৬ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৮, ২০১৭
এসও/জেএইচ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: ঢালিউড সাক্ষাৎকার মৌসুমী
কালিগঞ্জে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক বিক্রেতা নিহত
সুরা ফিল: হস্তীবাহিনীকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার বর্ণনা
টাঙ্গাইলে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক বিক্রেতা নিহত
বাকেরগঞ্জে গাছের সঙ্গে বেঁধে কিশোর নির্যাতনের অভিযোগ
টি-টোয়েন্টিতেও নারীরা হোয়াইটওয়াশ
চেন্নাইয়ের জয়, পাঞ্জাবের হারে প্লে অফে রাজস্থান
বিহারীলাল চক্রবর্তীর জন্ম
চাকরিক্ষেত্রে পরিশ্রম মেষের, চিন্তা বাড়বে সিংহের
আর্জেন্টিনার জার্সির কাটতিই বেশি!
মেয়াদোত্তীর্ণ ও পচা ১২০ মণ খেজুর ধ্বংস