দুঃখ থেকে সুখে | তানিয়া চক্রবর্তী

ধারাবাহিক গদ্য ~ শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

দুঃখ থেকে সুখে | তানিয়া চক্রবর্তী

আসলে জীবনের একটা বা একাধিক পর্ব দুঃখের হতেই পারে। চিরসুখী মানুষ কী নেই? নিশ্চয় আছে। কিন্তু সেও যদি প্রতিফলনের জায়গায় গিয়ে বসে, নিজের ছেঁড়া ছেঁড়া মুহূর্তের অভাব তার কাছে ফিরে আসবেই। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ইন্দ্রিয়, হরমোন ও মস্তিষ্কে প্রতিটি মানুষের দুঃখ উদ্দীপকের আয়োজন আছে। আর পৃথিবীর বিবর্তনের নিয়মটাও অদ্ভুত মজার। যা পৃথিবীতে আছে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জিনিসই ঈশ্বর বা প্রকৃতি আমাদের দিয়েছেন। একটা প্লাস-মাইনাসের খেলার মতো, অভিযোজনের সঙ্গে আমাদের সুখ-দুঃখের দান দেওয়া খেলা। দুঃখবোধ মূলত দুঃখের উৎস স্থান, সে প্রকৃত দুঃখই হোক বা ব্যক্তির দুঃখকাতরতা থেকেই জন্মাক। আসলে দুঃখ ও সুখের স্থানও তো পূরণ করে ব্যক্তির বাসনাজনিত বিষয় থেকে। লব্ধ ও সেই বস্তুর অভাব এই দুই থেকেই যে মধ্যের শূন্যস্থান তৈরি হয় সেখানে দুঃখ রচিত হয়।

চার্লস ডিকেন্স বলেছেন, “WE NEED NEVER BE ASHAMED OF OUR TEAR”।

ভিক্টর হুগো বলেছেন, “THOSE WHO DO NOT WEEP, DO NOT SEE”।

ডব্লিউ বি ইয়েটসের অনবদ্য কিছু লাইন এইমুহূর্তে তোলার প্রাসঙ্গিকতা মনে করে বলছি, তিনি লিখেলিলেন, “COME AWAY TO HUMAN CHILD! / TO THE WATERS AND THE WILD/ WITH A FAERY, HAND IN HAND/ FOR THE WORLD’S MORE FULL OF WEEPING/THAN YOU CAN UNDERSTAND”।

উইলিয়ম ফকনার তার দ্য ওয়াইল্ড পাম-এ বলেছেন, “আমাকে অনভিজ্ঞ হয়ে থাকা ও যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা এই দু’টোর মধ্যে বেছে নিতে বললে আমি নিশ্চিত দ্বিতীয়টি বেছে নেব”।

হুগোর মন্তব্য ধার করে বলছি, “চোখে জল না এলে সে চোখ দেখে না”—

এর যে গভীর মর্ম তার উপস্থাপনা খুব সহজ নয়। কোথায় মনে হয় কোনো কিছুর সক্রিয়তা তার পিওরিটি বা বিশুদ্ধতার ওপর নির্ভর করে। তাই যে চোখ এতো দেখে অর্থাৎ খারাপ ও ভালো এই দুই সে এতো বেশী দেখে যে তার প্রভাব ও প্রবাহের ওপর দিয়ে যদি অনুভূতির ধারাই না বয় তাহলে কি সে চোখের নজর স্পষ্ট হবে?

পিকাসোর ‘দ্য উইপিং ওম্যান’র ছবিপিকাসোর সেই ‘দ্য উইপিং ওম্যান’র ছবি যা ১৯৩৭ সালের সিভিল যুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে আসে। যন্ত্রণা আর তার মাধ্যম কান্নার রূপ দেখিয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও ভ্যান গগের বিতর্কিত ছবি যা ১৮৮২ সালে প্রকাশ্যে আসে, ছবির নাম “SORROW” যেখানে গর্ভবতী ন্যুব্জ এক নারীর সঙ্গে বসন্তের শেষে পাতা পড়া প্রকৃতির কথাও ভাবা হয়েছিল। এই বিশিষ্ট শিল্পীরা বিভিন্ন সময়ে দুঃখের যে প্রতীক তথা চিত্র এঁকেছেন তা অনবদ্য। দেহরেখার মাধ্যমে তার রূপের প্রকাশভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে। ফকনার যেমন বলেছেন, তিনি অভিজ্ঞতার বিচারে দুঃখকে বেছে নেবেন তার কথার অর্থ বোধহয় এরূপ, আসলে দুঃখের তো স্তর ভেদ আছে তাই দুঃখের রূপক বোধহয় সুখের দাবি নিয়ে আসে।

হুমায়ূন আহমেদ বোধকরি তার এই উপলব্ধি থেকেই বলেছিলেন, “জীবনে কিছু কিছু প্রশ্ন থাকে যার উত্তর কখনোও মেলে না, কিছু কিছু ভুল থাকে যা শোধরানো যায় না তেমনি কিছু কিছু কষ্ট থাকে যা আর কাউকে বলা যায় না”। আরও বলেছেন, “বাস্তবতা এতোই কঠিন যে কখনও কখনও বুকের ভেতর গড়ে তোলা বিন্দু বিন্দু ভালোবাসাও অসহায় হয়ে পড়ে”।

অসৎ আনন্দের চেয়ে পবিত্র বেদনা ভালো— হোমারের এই উক্তি একটা সমাজের মূল্যবোধকেই নাড়িয়ে দিতে পারে। দুঃখ তো আসলে কোনো বীভৎস জিনিস নয় এটা একটা শূন্যস্থান বা চক্রের গঠন যেমন, একটি মানুষ কখনই সবসময় নিশ্চয় খেতে পারে না কারণ, খাওয়ার লোভ থাকলেও সিস্টেম সেটার বিরতি চায়। ফলস্বরূপ তাকে কিছু সময় না খেয়েও থাকতে হয়। আর ওই না খাওয়াটাই পরবর্তী খাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে আসে। তাই মার্ক টোয়েন বলেছেন, “দুঃখ সম্ভবত শক্তিশালী কারণ সে নিজেই নিজের বন্ধু কিন্তু আনন্দকে উপভোগ করতে হলে সঙ্গীর প্রয়োজন হয়”। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো এপার আর ওপারের নদীর আপেক্ষিকতায় তীব্রভাবে বুঝিয়েছেন, দুঃখ-সুখের কর্তা আসলে আমরা, সেটা কেবলই বোধ নির্ভর!

মস্তিষ্ক যেহেতু ইন্দ্রিয় ও স্নায়ু চালিত সেখানে একটি রোবোটিক্স অ্যাক্টিভিটি চলে। কিন্তু যেহেতু এই রসের দেহ যন্ত্র হয়েও যন্ত্র না ফলে তার দারণ দেমাক। সে চোখের জলেই সবার আগে আরও বেশী করে মানুষ। শরীরের মৌলিক চাহিদা বাদ দিলে পড়ে থাকে মনের আসক্তি আর তার উপকরণ বললেই চলে আসে দুঃখ, শোক। আর কেউ যদি দুঃখ-শোক বাদ দিয়ে বাঁচতে চায় তবে তার জীবনেরই কোনো অর্থ থাকার কথা নয়। কারণ, সুখ ও আনন্দ থেকেই দুঃখের আগমন হবে আর দুঃখ থেকেই সুখের প্রতি প্রত্যাশী হবে মন। হ্যাঁ, একথা সত্যি শোকের সংবেদনে যাওয়া মন যদি নিজেকে যাচাই না করতে পারে সে ত্রাসের কাছাকাছি দুঃখকে নিয়ে চলে যায় ফলে জীবনের চক্রের কোনো মানে থাকে না। কাজেই আমরা দুঃখ-সুখের স্বপ্ন দেখি। শুধু সুখ যদি পৃথিবীতে থাকে সেখানে কখনও সুখের মাহাত্ম্য নিরুপিত হবে না। আলো আর অন্ধকারের খেলাতেই তো আমরা মাতোয়ারা। আসুন আমরা সুখের হই। আসুন আমরা দুঃখের হই। আসুন আমরা জীবনের হই।

জন কীটস বলেছিলেন, “HOW BEAUTIFULL ,IF SORROW HAD NOT MADE/SORROW MORE BEAUTIFUL THAN BEAUTY’S SELF”।

বাংলাদেশ সময়: ১৩৫৮ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭
এসএনএস

শেরে বাংলানগরে নয়, সচিবালয়েই হচ্ছে ‘টুইন টাওয়ার’
ভূমিকম্পে বেরিয়ে এলো প্রাচীন মন্দির
টাঙ্গাইলে মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত ৩
যেমন ছিল ‘ওৎজি’ মানবের খাবার
বদরগঞ্জের শোলার খোঁজে দূর-দূরান্তের মালিরা
যে শহরে কোটি টাকা আয় করেও গরিব!
তদবিরে বাড়তি চাল বরাদ্দ মিললেও মেলেনি বরাদ্দপত্র
বছরে ৫০ কোটি মেট্রিকটন ক্ষতিকর পোকামাকড় খায় পাখি
যেভাবে চালু করবেন জিমেইলের স্মার্ট কম্পোজ
জয়পুরহাটে ২৫ কোটি টাকা ব্যায়ে বটতলী সেতুর নির্মাণ শুরু